মানুষ যত বড়, মাথা তত ঠান্ডা- জে. আলী

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা বেলা শিষ্যদের নিয়ে খেতে বসেছেন যীশু। সেটা ছিলো তার জীবনের শেষ আহার- The Last Supper. একটি রুটি ভেঙে টুকরো করে তিনি সবাইকে খেতে দিলেন। একটু আঙ্গুরের রস সবাইকে ভাগ করে দিলেন নিজের হাতে। আহার শেষ, মানবতার পথ প্রদর্শক এক আশ্চর্য কাজ করলেন। এক গামলা জল আর একটি তোয়ালে নিয়ে তিনি প্রত্যেক শিষ্যের পা যত্ন করে ধুয়ে মুছে দিতে লাগলেন।। সকলেই উৎকণ্ঠিত নির্বাক। একটু পর তাদেরকে যীশু বললেন, তোমরা এখন থেকে পবিত্র হয়েছো। আমি যেমন তোমাদের ভালোবেসেছি, তেমনি তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। তারপর হঠাত বল্লেন্‌ তোমাদের একজন আমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করবে। ভক্তরা সচকিত হয়ে উঠল, কে কে সে।

ভক্ত পিটার বললেন, আমি কখনো করবো না।

সাথে সাথে যীশু বললেন, আজ ভোরের আগে মুরগী ডাকার আগেই তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।

খুদ্ধ পিটার দৃঢ় কন্ঠে বললেন, তিনি প্রভুর জন্য মৃত্যুবরণ করতে রাজি তবুও তাকে অস্বীকার করবেন না।

কিন্তু সেদিনি শেষ রাত্রে পিটার ধরা পড়ার ভয়ে বলেছিলেন, না আমি যীশুকে চিনিনা।

যীশুকে যখন ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল, সেই সময়, ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন পিটার।

একজন দাসী তাকে চিনতে পারে। পিটার বলে উঠলেন, না না আমি যিশুর শিষ্য নই। তারপর আরেকবার।

সেবারো তিনি অস্বীকার করলেন। তৃতীয়বার ধরা পড়াইয় সকলে হইহই করে উঠে এবং তাকে মারতে শুরু করে- পিটার বলে উঠলেন, না আম্মি যীশুর শিষ্য নই, আমি তাকে চিনি না।

ঠিক এই সময় ভোরের প্রথম মুরগী তিনবার ডেকে উঠল “কুক কুরে কুক”। সঙ্গে সঙ্গে পিটারের মনে পড়লো গুরুর কথা। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

কিন্তু আসল বিশ্বাসঘাতক ছিএন জুদাস ইস্কারিয়াট। শিষ্যদের সঙ্গে যহ্ন যিশু কথা বলছিলেন তখন চুপি চুপি সরে পড়ল জুডাস এবং মাত্র ত্রিশটি মুদ্রার বিনিময়ে শত্রপক্ষের হাতে গুরুকে ধরিয়ে দিতে রাজি হলো।

আসলে জুডাসের ইর্ষা ছিলো অন্য শিষ্যদের প্রতি। জুডাস যখন যিশুর কাছে গিয়ে বিদায় চুম্বন দিলো, তখন যিশু প্রসন্ন গলায় তাকে বললেন, “এই চুম্বনের সঙ্গে তুমি আমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলে”।

পরদিন সকালে যিশুকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় রোমান শাষক পন্টিয়াস পায়লটের কাছে। দুপাশে কৌতুহলী জনতা- তার মধ্যে হেটে চলেছে যিশু।

এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জুডাস। একবার গুরুর অবস্থাটা নিজে চোখে দেখার ইচ্ছা তার। দড়ির বাধন কেটে বসেছে শরীরে, রক্ত ঝরছে টপ টপ করে, রাত্রী জাগরনে শরীর অবসন্ন, জনতা গায়ে থুতু ছিটাচ্ছে, যে ইচ্ছা কিল চড় মারছে। তবুও ওই জর্জরিত শরীর রোদের আলো পড়ে জ্যোতিষ্মান।

হঠাত যিশু মুখ তুলে তাকালেন, এক মুহুর্ত থাম্লেন, সোজা জুডাসের সঙ্গে চোখাচোখি হলো তার। প্রচন্ড ভাবে মুচড়ে উঠল জুডাসের হৃদপিণ্ড- এই কি কোন মানুষের চোখ। এ চোখে ক্রোধ নেই, ভর্তসনা নে, দুঃখ নেই, হাজার বছরের সঞ্চিত তুষারের মত শান্ত সে দুটি চোখ।

আরেকজন মহামানবের কথা বলি।

খৃস্টের জন্মের সাড়ে চারশো বছর আগে গ্রিসে জন্মগ্রহন করেন সক্রেটিস। তিনি ছিলেন মহান দার্শনিক।

দার্শনিক বললেই যে চরিত্র আমাদের চক্ষে ভেসে ওঠে অর্থাৎ কমে নিস্পৃহ, জ্ঞানসমুদ্রে সর্বদা মগ্ন, সমাজ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন- তার সাথে সক্রেটিস এর কোন মিল নেই। তার শরীর ছিলো অত্যান্ত সবল। তার শিষ্য প্লেতো বলেন- “তার শরীর ও মন উভয়ই ছিলো ইস্পাতের মতো’।

এক দরিদ্র কারিগরের ঘরে জন্মেছিলেন সক্রেটিস। শৈশবের সর্ববিদ্যা শিক্ষা করেন- তার মধ্যে জ্যোতিষ ও জ্যামিতিও বাদ ছিলো না। তিনি প্রচন্ড ধৈর্য এবং কস্টসহিষ্ণূ ছিলেন। তিনি কখনো পায়ে জুতা পড়েননি। জুতা তার কাছে বাহুল্য মনে হতো। একবার তিনি নগ্ন গাত্রে গ্রীসের প্রচন্ড শীতে সেচ্ছায় খোলা আকাশের নিচে একটানা চব্বিশ ঘন্টা কাটিয়েছিলেন, শুধুমাত্র নিজের ধৈর্য এবং সহ্যক্ষমতা পরীক্ষার জন্য। দেশের জন্য তিনি তিনবার যুদ্ধে গিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলতেন- “আমি তোমাদের চেয়ে জ্ঞানী কারন আমি জানি আমি কত কম জানি, অনেকেই এটা জানেনা, আর তাদের সাথে আমার তফাৎ এখানেই”।

তিনি চাইতেন মানুষের মনের অন্ধকারকের দূর করে তার মধ্যে বিচার বিবেক কে জাগ্রত করতে যাতে তারা সঠিকভাবে নিজেদের কর্মকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। এই মহান দার্শনিককে সত্তর বছর বয়সে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো প্রধানত তিনটি।

১। দেশের প্রচলিত দেবতাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন।

২। নতুন নতুন দেবতাদের প্রবর্তন করার চেস্টা করা এবং

৩। তৃতীয়টি সবচেয়ে মারাত্মক। তিনি যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে তাদের বিপথে চালিত করছে।

এথেন্সের তিনজন খ্যাতিমান পুরুষ তার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগগুলো এনেছিলেন। সে এক বিচিত্র বিচারের কাহিনী। পাঁচশ একজন বিচারকের সামনে দাঁড়ানো অভিযুক্ত সক্রেটিস। তার পক্ষে তিনি কোন উকিল ও রাখেননি।

সক্রেটিসের প্রদত্ত জবানবন্দী দুজনে লিখে রেখেছিলেন- একজন তার প্রধান শিষ্য প্লেটো, অন্যজন জেনোফেন। প্লেটোর এই রচনার ইংরেজী অনুবাদের নাম “এপোলজি”। এই এপোলজি কেই পৃথিবীর গদ্য সাহিত্যের অন্যতম বিরল স্বার্থক রচনা বলে ধরা হয়। এত বড় দার্শনিক সক্রেটিস, তিনি কিন্তু কোন বই বা বড় কোন উপদেশ লিখে যাননি। জেলে থাকা অবস্থায় জীবনের শেষদিনগুলোতে কএক্টি কবিতা লিখেছেন মাত্র। তিনি অতি সাধারণ বিষয়ে, যেমন- শিশু পালন, রোগীর সেবা, পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য, আহার বা স্বাস্থের পক্ষে উপকারী- এসব প্রসঙ্গে তিনি কথা বলতেন। তিনি ঘোষ্ণা করেছেন- “যে মানুষ সৎ, ইহ্লোক বা পরলোকে তার কখনো কোন ক্ষতি হতে পারে না”।

বিচারকদের উদ্দ্যেশ্যে তার শেষ কথা এখনো সারা পৃথিবীর মানুষ মনে রেখেছে। বিচারকদের উদ্দ্যেশ্য করে তিনি বলেছিলেন – “আমি চলেছি মৃত্যুর দিকে আপনারা চলেছেন জীবনের দিকে, এক্মাত্র ঈশ্বরই জানেন- কার দিকটা শ্রেষ্ঠ’। মৃত্যুদন্ডের রায় শুনে এতটুকোও বিচলিত হননি।

এই মহান দার্শনিকের মৃত্যু দিনের বর্ণনা শুনে আড়াই হাজার বছর পরে মানুষ হতভম্ব হয়, কিভাবে একজন মানুষের মাথা এতটা ঠান্ডা হতে পারে, হতে পারেন এতটা ধৈর্যশীল অথবা মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীন। বিচারের পর এক্মাস তিনি জেলে ছিলেন। এই এক মাসের মধ্যেই তার শিষ্যরা একবার জেল ভেঙে তার পালাবার ব্যাবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। শিষ্যদের পীড়াপিড়িতে তাদের প্রশ্ন করেছেন- “তোমরা আমকের জেল থেকে পালিয়ে নিইয়ে যেতে পারো কিন্তু পৃথিবীর যেকোন দেশে গিয়েও আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে কেও বাচাতে পারবে?

তাছড়া তিনি দৃড় ভাবে বললেন – “যে কোন দেশের নাগরিকেরই সেই দেশের আইন শৃংখলা এনে চলা উচিত”।

প্রিত্য পাঠক, আমরা জীবনের কত তুচ্ছ অকিঞ্চিতকর বিষয়ের জন্য রেগে যাই, হা হুতাশা করি, অন্যকে গাল্মন্দ করি, অপরাধী সাজাই, অন্যায় করেও নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাই অথচ একজন মহান মানুষের মাথা যে কত ঠান্ডা হতে পারে তা বলেই এই অধ্যায় শেষ করবো।

ঠিক দুদিন আগে স্বপ্নে সক্রেটিস তার মৃত্যুরক্ষনটি জানতে পারলেন। মৃত্যুর দিন সন্ধাবেলা তিনি তার শিশুপুত্রকে বললেন- তুমি যাও, বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। অত্যান্ত শান্ত এবং প্রফুল্ল ছিলেন তিনি, যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা কতটা সহজ। তাকে ঘিরে বসে আহচ এতার শিষ্যরা। আসন্ন বিচ্ছেদের চিন্তায় তারা অনেকেই কাতর। আত্মার অবিণাশত্ব সম্পর্কে অনেকের সংশয় ছিলো। তখন তিনি দেহ এবং আত্মার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করলেন। আলোচনা শেষ এ মৃত্যুর পর যেভাবে তাকে কবর দেওয়া হবে সেইভাবে নিজের শরীর এবং বেশবাহ প্রস্তুত করলেন। যাতে মৃত্যুর পর তার শরীর অন্য কেও স্পর্শ করতে না পারে।

সুর্য্য তখ পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। ঠিক সূর্যাস্তের সময় কারাগারের পরিচালক এসে জানালেন-সময় শেষ।

সেই রাজ কর্মচারী গভীর বেদনায় কাঁদতে কাঁদতে বললেন। সক্রেটিস ই তার জীবনে সবচেয়ে ভদ্র, সবচেয়ে সাহসী এবং শ্রেষ্ঠ কয়েদী। তারপর যমদূতের মত হেম্লকের পাত্র নিয়ে জল্লাদ প্রবেশ করল। এই হেমলক তীব্র বিষ যা পা থেকে আরম্ভ করে হৃদপিন্ডে পৌছিয়ে সমস্ত শরীরকে অসাড় করে ও মৃত্যু ঘটায়।

জল্লাদ বলল- “ হেমলকের এক ফোঁটাও যেন নস্ট না হয়’।

“না, এক ফোঁটাও নস্ট হবে না”- উত্তর দিলেন সক্রেটিস।

তারপর নীরবে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন এবং মুখে হেম্লকের পাত্র তুলে নিলেন। সেই ঘরের উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষের মন ভীষন আকার ধারণ করেছে তখন। যেন প্রত্যেকেই মাথায় ভীষণ ভারী বোঝা বইছে। পুরো পাত্রের সবটুকো বিষ পান করলেন তিনি। তার মুখ একটুও বিকৃত হলোনা। এই দৃশ্য দেখে সকলেই উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলেন, একজনের হিস্টেরিয়ার মত হলো। সক্রেটিস নিজে তার কাছে এসে মাতাহ কোলের উপর তুলে ধরে চখে মুখে জল দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলেন। তখন জল্লাদ বলল- কিছুক্ষন সক্রেটিস কে উঠে ঘরের ভেতর পায়চারি করতে হবে- না বিষ সারা শরীর ছড়াবে না। এই নিষ্ঠুর অনুরোধে ভক্তদের মন শিউরে উঠল, যেন অসংখ্য না না ধ্বনি জেগে উঠে চারপাশে, কিন্তু ভাবান্তহীন মুখ সক্রেটিস এর , নিজের কস্টের মৃত্যুর বদলেও জল্লাদের দায়িত্বে বাধা দিতে চান না তিনি। তিনি জল্লাদের কথায় উঠে উপর তেহকে নিচে হাত পা ছুড়ে পায়চারি করতে লাগলেন। ক্রমে তার পা অত্যান্ত ভারী ও অসাড় হয়ে এলো। তিনি শুয়ে পড়লেন এবং নিজেই চাদরে তার মুখ ঢাকা দিলেন। কিছক্ষন পর সব চুপ ,মনে হলো যেন পৃথিবীর ঘুর্ণন পর্যন্ত থেমে গেছে। কোথাও নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত নেই। হঠাত সক্রেটিস মুখকের উপর দেয়া চাদর সরিয়ে বললেন – “ক্রিটো, আমাদের একটা মুরগী ধার আছে এসক্লিপিয়াসের কাছে, ওকে মনে করে শোধ করে দিও”।

সেই তার শেষ বাণী। তখনই আবার মুখে চাদর টেনে দিলেন। কএক মুহুর্ত সব শান্ত। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সক্রেটিস যাত্রা করলেন অমৃতলোকে। সক্রেটিসের মতি মহান বিধাতা সৃস্টি করেছেন আপনাকেও। তার মতই সকল মানবিক গুনী রয়েছে আপনার মধ্যে। তারপরেও কেন আপনি জীবনের চূড়ান্ত উতক্ররষতায় পৌছতে সক্ষম হচ্ছেন না?

এর প্রধান কারণ আপনার নিয়ন্ত্রনহীন রাগ।

অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্ত, চিন্তার ক্ষুদ্রতা, পরশ্রী কাতরতা অথবা নিজের অজান্তেই অন্যের দ্বারা প্রচন্ড প্রভাবিত হউয়ার অভ্যেস। যা আপ্পনার মনকে অশান্ত করে, মানবিকতাকে বিপর্যস্ত করে। সর্বোপরি আপনার অবস্থা হয় ঝড়ের কবলে পড়া পালছেড়া জাহাজের মত অথচ অত্যান্ত সম্ভাবনাময়, প্রতিভাবান মানুষ আপনিও। পরিবার সমাজ দেশ ও বিশ্বকে দেয়ার মত অনেক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে আপনার ভেতর। নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন কেন আপনি সেই পথে হাতবেন না, সেই কর্মে ব্রতী হবেন না, সেই জ্ঞান অর্জন করবেন না, যে কর্ম ও জ্ঞন আপনাকে বাচিয়ে রাখবে মৃত্যুর পর হাজার বছর মানুষের মনে। তবেই না স্বার্থক হবে মানব জনম।

জে. আলী

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ব্যাবসায় প্রশাষন বিভাগ

দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close