Trending

কোভিড-১৯ কি, বর্তমান অবস্থা, ঝুকি ও প্রতিকার- ডাঃ অনুপম দাস, এমবিবিএস, সিসিডি

এই মুহুর্তে পৃথিবী ব্যাপী করোনা ভাইরাস সৃষ্ট কোভিড-১৯ নামে এক রোগের এক মহামারী চলছে।
ভাইরাস ঘটিত এই রোগ সারা বিশ্বব্যাপী অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে যা কোন নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চল নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকির কারন।
সারাপৃথিবী ব্যাপী যখন কোন মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে বলা হয় প্যান্ডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারী।

রোগের ইতিহাসঃ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, করোনা ভাইরাস কোন নতুন ভাইরাস নয়, আগেও এই ভাইরাস দ্বারা রোগ সৃষ্টির ইতিহাস আছে।
এই ভাইরাস দ্বারা পশুপাখির ও মানুষের সর্দি-জ্বর বা এ ধরনের অসুখ হত। অতীতের দুইটি উল্লেখযোগ্য মহামারী ছিল সার্স, যা ২০০২-০৩ সালে চীনের দক্ষিনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ২৩ টি দেশে সংক্রমিত হয়। এতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮ হাজার এবং ঝুঁকি ছিল কম। তবে উল্লেখ্য যে এই ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় চিকিৎসা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী না থাকা ও সংক্রমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার না থাকা।
অন্যদিকে মার্স নামে এই গোত্রভুক্ত আরেকটি রোগ ২০১২ সাথে সৌদি আরবে শুরু হয়। ধারনা করা হয় উট থেকে এই ভাইরাস মানুষে সংক্রমিত হয়। তবে এই রোগ মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় মূলত স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে। অরক্ষিত ভাবে ও কোন বিশেষ সুরক্ষা না নিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার কারনে এই রোগ মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। সৌদি আরবের পাশাপাশি আরব আমিরাত ও কোরিয়া প্রজাতন্ত্রেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগের সংক্রমণের হার খুব বেশি না হলে মৃত্যু হার ছিল অনেক বেশি।

করোনা ভাইরাস গোত্রেরই আরেকটি ভাইরাস যা সাম্প্রতিক ২০১৯ সালে চীনের উহানে প্রথম সংক্রমণ ঘটায়। জ্বর, কাশি, দূর্বলতার মত সাধারন লক্ষন দিয়ে এটি শুরু হয়। এছাড়া ব্যথা, সর্দি, নাক বন্ধ হয়ে আসা বা ডায়রিয়া হতে পারে। সাধারণত এসব লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।

বর্তমান অবস্থাঃ
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, আক্রান্ত রোগীর শতকরা ৮০ ভাগই সাধারন চিকিৎসায় ভাল হয়ে যায়। তবে প্রতি ৬ জনে এক জনের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। এদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট সহ নানা জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। যেসব মানুষের উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস সহ নানাবিধ রোগ ও দূর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে তারা এই ক্ষেত্রে বেশি ঝুকিপূর্ন।

কেন এই রোগ এত ঝুকিপূর্ণঃ
এই রোগ এত ঝুকিপূর্ন তার কারন একটাই, এই রোগ দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই রোগ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক মহামারীর আকার ধারন করেছে এবং পৃথিবীর প্রায় সমস্ত অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়েছে।
মূলত হাঁচি কাশি ইত্যাদির মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

রোগ প্রতিরোধে করনীয়ঃ
এই রোগ থেকে বাঁচতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও রোগতত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমূহের নির্দেশনা সমূহ হল-

বার বার হাত পরিষ্কার রাখুনঃ
দেখা গেছে শুধু করোনা ভাইরাসই নয়, অনেক রোগ জীবানুই হাতের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই কোন কিছু স্পর্শ করলেই সাবান পানি দিয়ে ভালভাবে হাত ধুয়ে নিন। যদি কোন কারনে হাত ধোয়ার সুযোগ না থাকে সেক্ষেত্রে এলকোহল সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
সকল বিশেষজ্ঞ গন হাত ধোয়ার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই আমরাও বলতে পারি- আপনার নিরাপত্তা আপনার হাতেই। বিশেষত নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ করার আগে অবশ্যই হাত ঝুয়ে নেবেন।

সামাজিক/শারিরীক দূরত্ব বজায় রাখুনঃ
যেকোন প্রকার জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। সরকারী নির্দেশ মত ঘরেই থাকুন। কোন প্রয়োজনে কোন স্থানে গেলে অবশ্যই পরষ্পর থেকে কমপক্ষে ১ মিটার বা ৩ ফুট দূরত্ব রক্ষা করে চলুন।
এতে করে একজন থেকে অন্যজনে হাঁচি কাশির মাধ্যমে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যাবে।

চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
স্পর্শ করার প্রয়োজন হলে অবশ্যই হাত সাবান দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে তারপর স্পর্শ করবেন।

হাঁচি কাশির সময় অবশ্যই মুখ ঢেকে নেবেন।
টিস্যু দিয়ে ঢাকলে সাথে সাথে সেটি মুখবন্ধ কোন পাত্রে ফেলে দিন ও হাত ধুয়ে নিন। হাতের কাছে কিছু না থাকলে কনুই দিয়ে ঢেকে নিন ও পরে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

কোন খাবার বা কাজ কি রোগ মুক্ত রাখবে?
এই মুহুর্তে নানা স্বার্থান্বেষী মহল নানা রকম গুজব সৃষ্টিতে ব্যস্ত। কোন ধরনের গুজবে কান দিয়ে নিজের ও সমাজের ক্ষতি ডেকে আনবেন না।
কোন বিশেষ ধরনের খাদ্য, পানীয়, ওষুধ কোন কিছুই করোনা সংক্রমন থেকে বাঁচাতে পারে এমন কোন প্রমান গবেষণায় প্রমানিত হয়নি এখনো পর্যন্ত।

তাহলে উপায়?

তবে গবেষণায় প্রাথমিক ভাবে তথ্য পাওয়া গেছে যে সাধারন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়লে এই রোগের ঝুঁকি কমে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের বাইরে কোন বিশেষ খাদ্য, পানীয় বা ওষুধ রোগ প্রতিরোধ বাড়ায় না।
বরং স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, শাক সবজি, ফল-মুল, পর্যাপ্ত পানি পান ও পর্যাপ্ত ঘুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

তাই যতদুর সম্ভব ঘরে থাকুন, স্বাভাবিক খাদ্যাভাস অনুসরন করুন এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার- নিজের ও চারপাশের মানুষের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস নিশ্চিত করুন।

সংক্রামক ব্যধির মহামারীর ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সত্য হল- একা হাজার চেষ্টা করলেও বাঁচতে পারবেন না। আপনার চারপাশের মানুষ যদি সুস্থ্য থাকে তবেই আপনিও সুস্থ্য থাকবেন। আশেপাশের কেউ সংক্রমিত থাকলে আপনারও সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

তাই সকলে নিয়ম মেনে চলুন, চারপাশের মানুষকে সাথে নিয়েই সুস্থ্য থাকুন।
আশা হারাবেন না,
পৃথিরীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এর চেয়ে অনেক বড় বড় মহামারী আমরা কাটিয়ে উঠেছি। আশাকরি এই মহামারীতে জয় হবে মানুষেরই।

ডাঃ অনুপম দাস, এমবিবিএস, সিসিডি
এমফিল রিসার্চ ফেলো- পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফর্মেটিক্স
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেসনালস

ডা. অনুপম দাস, বর্তমানে জনস্বাস্থ্য চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। এমবিবিএস সম্পন্ন করে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি প্রকল্পে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে ব্র‍্যাকের মাধ্যমে কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের কেস কন্ট্রোল ট্রায়ালে কো-ইনভেস্টিগেটর হিসেবে কাজ করেছেন।
বর্তমানে সেন্টার ফর নন কমিউনিকেবল ডিজিজ এন্ড নিউট্রিশনের অসংক্রামক ব্যধি সার্ভিলেন্স কাজে যুক্ত এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেসনালস এ জনস্বাস্থ্য বিষয়ে এমফিল গবেষণারত।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close