“এমপ্লোয়ার চায় এই মানুষটাকে দিয়ে আমার কাজটা হবে কিনা যেটা সিজিপিএ দ্বারা এনশিওর করা যায় না”- জে. আলী

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ স্কলার্সের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক জুলফিকার আলী বাংলাদেশের বিজনেস এডুকেশন সম্পর্কে তার নিজস্ব চিন্তাধারা জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি নিউজ বিডিকে এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন ইউনিভার্সিটি নিউজ বিডি এর সঙ্গে।

অধ্যাপক জুলফিকার আলী! যিনি জে. আলী নামেও অধিক পরিচিত তিনি ১৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে দেশের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সসম্মানে শিক্ষকতা করে আসছেন। সান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পরে ১০ বছর তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির এমবিএ ডিপার্টমেন্টের কো অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করেন। বর্তমানে ২০১৭ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অফ স্কলার্সের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখির ক্ষেত্রেও তিনি দেখিয়েছেন সমান দক্ষতা এবং প্রতিভা। তার রচিত সফলতার প্রথম পাঠ, সফলতার দ্বিতীয় পাঠ “চাবুক”, ইদুরের পকেটমানি প্রতিটি বইই পাঠক সমাজে জাগিয়েছে তুমুল সাড়া এবং তরুনদের ক্যারিয়ারের জন্য যা অত্যন্ত সহায়ক ভুমিকা পালন করছে। শিক্ষক, লেখক পরিচয়ের বাইরেও তার অন্য আরেকটি পরিচয় তিনি একজন বড় মাপের মোটিভেশনাল স্পিকার। তার লেখালেখি, শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মোটিভেট করছেন এবং এঁর পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন জে. আলী একাডেমী নামে একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে তিনি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস।

প্রশ্ন: বিজনেস এডুকেশনে আসলে কাদের আসা উচিৎ?
উত্তরঃ আসলে বিজনেস এডুকেশন বলতে আমরা যা মনে করি যে, যারা ব্যাবসা করবে ভবিষ্যতে বা যারা ব্যবসার সাথে জড়িত কোনও প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছে বা করবে তাদের আসা উচিৎ বিষয়টা এমন না।যে সিলেবাস আমরা পড়াই তার উদ্দেশ্য কিন্তু শুধু নতুন উদ্যোক্তা তৈরী করা না বরং একজন মানুষ কিভাবে নিজেকে গড়ে তুলবে, নিজের কর্মদক্ষতা প্রকাশ করবে অথবা বাড়াবে এবং সর্বোপরি সমাজের একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে এই মানসিকতার যেকোনও মানুষই বিজনেস এডুকেশনে আসতে পারে নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য। কারন এখানে যেমন এখানে যেমন আমরা একাউন্টিং পড়াই, ম্যানেজমেন্ট পড়াই, মার্কেটিং পড়াই ঠিক তেমনিভাবে আর্ট অফ লিভিংও পড়াই।কিভাবে একজন ছাত্র মানুষ চিনবে, কিভাবে সমাজে নিজের একটা জায়গা করে নেবে, কিভাবে কমিউনিকেশন স্কিল ডেভেলপ করবে। আর একজন মানুষকে প্রতিষ্ঠিত হবার পরে সেই প্রতিষ্ঠাকে ধরে রাখার জন্য যে গুনগুলো দরকার সেগুলোও আমরা আমাদের বিজনেস এডুকেশনে পড়িয়ে থাকি।

প্রশ্ন: বিজনেস স্কুলের অতীতটা কেমন ছিলো, এবং ভবিষ্যতে কেমন ইমেজ দেখতে পাবো বলে আপনার ধারণা? 
উত্তরঃ আসলে যায় দিন ভালো, সবাই বলে আমিও তাই বলবো। তবে এখন যে চেঞ্জটা আসছে তা হলো টেকনোলজিক্যাল চেঞ্জ। যেমন আগে আমরা যে বিষয়টা জানতাম না সেটা জানার জন্য একজন শিক্ষককে দিনের পর দিন লাইব্রেরীতে বা সিনিয়রদের কাছ থেকে শিখে এসে তারপরে ক্লাসে পড়াতে হতো। বর্তমানে টেকনোলজির কারনে, বা গুগলের কারনে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে ধরেন ক্লাসে আমার এক ছাত্র আমাকে একটা প্রশ্ন করেছে উত্তরটা হয়তো আমার জানা নেই। আমি তখন বলি যে আমাকে একটু সময় দাও, আমি জেনে তোমাকে জানাচ্ছি। এই যে টেকনোলজিক্যাল চেঞ্জ জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রকে যেরকম সমৃদ্ধ করেছে ঠিক তেমনিভাবে ব্যবসায় শিক্ষাকেও পরিবর্তিত করেছে সামনে আরও পরিবর্তিত হবে। এখানে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অন্য যেকোনও প্রফেশনের চেয়ে ব্যবসায় জগতের টেকনোলজিক্যাল চেঞ্জগুলো একটু বেশী তো আমাদের ছাত্রছাত্রীদেরকে আমরা সেভাবেই গড়ে তোলার চেষ্টা করছি যেন কর্পোরেট জগতের যেকোনও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তারা খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তাছাড়া কিন্তু আগামী সময়গুলোতে ব্যবসায় শিক্ষা নেয়ার পরও জব মার্কেটে নিজেদের কর্মদক্ষতা এবং অবদানকে তুলে ধরতে পারবে না।

প্রশ্ন: বিজনেস স্টাডিসে উচ্চশিক্ষা এবং তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?
উত্তরঃ আসলে একটা দেশ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিমন্ডল কিন্তু আবর্তিত হয় ব্যবসা বাণিজ্যের দ্বারা। বাংলাদেশের যে বৈদেশিক রেভিন্যুটা আসে এটার বড় একটা অংশ আসে গার্মেন্টস থেকে এবং আরেকটা অংশ আসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স থেকে। তো এই গার্মেন্টস সেক্টরটা তো ব্যবসায়ের পার্ট। এখন ধরেন গার্মেন্টসের লো লেবার কস্টের কারনে আমরা ছিলাম গার্মেন্টস শিল্পে অন্যতম বড় একটা দেশ কিন্তু বর্তমানে টেকনোলজির চেঞ্জের কারনে, প্রডাকটিভিটি চেঞ্জের কারনে কম্পিটিশন বেড়ে যাবার কারনে ব্যবসায় শিক্ষার প্রয়োগ যদি না হয় তাহলে কিন্তু এই বাজার আমরা অচিরেই হারাবো। এবং অলরেডি কিন্তু একটা জায়গায় আমাদের ল্যাকিংস দেখা দিচ্ছে এবং সব মহলেই এটা আলোচিত হচ্ছে যে বাংলাদেশের টপ লেভেলের এক্সিকিউটিভ কিন্তু বাংলাদেশে তৈরী করতে পারছি না আমরা। তো এই যে গ্যাপটা এই গ্যাপটা কেন হচ্ছে কারন ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকরা সমৃদ্ধ নয় অথবা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটা মজবুত নয় এই জন্যই কিন্তু ওয়ার্ল্ডক্লাস এক্সিকিউটিভ আমরা তৈরী করতে পারছি না। আমাদের ইন্ডিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, চায়না থেকে লোকবল হায়ার করতে হচ্ছে। তো আমাদের আসলে ব্যবসায় শিক্ষাটাকে গতিশীল করা উচিৎ, সমৃদ্ধ করা উচিৎ যাতে করে উপর লেভেলের এক্সিকিউটিভ আমরা নিজেরাই তৈরী করতে পারি।

প্রশ্ন: এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটি বা ক্লাব একটিভিটির গুরুত্ব কতটুকু বলে আপনার মনে হয়?  
উত্তরঃ আসলে এটার গুরুত্ব এভাবে বলাটা কতটুকু যৌক্তিক হবে জানিনা। আমি মনে করি একজন ছাত্রের পাঠ্যবই এর চেয়েও বেশী জরুরী হলো এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিজে জড়িত থাকা। কারন যে ছেলেটা ডিবেট করে, সেই ডিবেটের জন্য যতখানি ডেডিকেশন নিয়ে সে পড়াশনা করে, একাউন্টিং এ এপ্লাস পাবার জন্য ততখানি ডেডিকেশন নিয়ে সে পড়ে না। যে ছেলেটা ইংলিশ স্পিকিং ক্লাব করে, সে ক্লাবের জন্য সে যে শ্রমটা দেয় এবং যে স্বাচ্ছন্দবোধটা সে করে সেটা হয়তো আরেকটা পাঠ্যবইয়ের জন্য তা করে না। সো নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য একটা ছাত্রের উচিৎ এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিসে নিজেকে ইনভলভ করা কারন এই ইনভলমেন্টের মাধ্যমে তার মধ্যে একটা পরিছন্ন শিক্ষার উদ্যোগ চলে আসে। সে ইনস্পিরেশন পায়, মোটিভেশন পায়। এজন্য  নিজেকে সমৃদ্ধ রাখার জন্য একজন ছাত্রের উচিৎ নিজেকে এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিসের সাথে নিজেকে জড়িত রাখা যেটা আমি একজন শিক্ষক হিসেবে খুব স্ট্রংলি রেকমেন্ড করবো।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে তো অনেকগুলো সরকারি এবং বেসরকারী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এসেছে। এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস রাইজের সম্ভাবনা কতটুকু?
উত্তরঃ এটা আসলে সম্ভাবনার চেয়ে চ্যালেঞ্জটাকে বেশী গুরুত্ব দিবো আমি। কারন ব্যবসায় শিক্ষার যে চাহিদা আছে সেই চাহিদা অনুযায়ী সেই মানের শিক্ষার্থী কিন্তু আমরা বের করতে পারছি না। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু দুর্বলতা আছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই সামনে টিকে থাকবে যারা ছাত্রছাত্রিদেরকে সত্যিকার কোয়ালিটি দিয়ে গড়ে তুলতে পারছে। আর সত্যিকার কোয়ালিটি এডুকেশন ছাড়া নতুন বা পুরাতন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই সারভাইভ করা সম্ভব হবে না। এজন্য আমাদের কোয়ালিটির উপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং ছাত্রদেরকে বর্তমান সময় এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে হলে যে যোগ্যতা গুলা দরকার তা শেখাতে হবে এবং নতুন টেকনোলজিগুলোর সাথে কোপ আপ করিয়ে গড়ে তুলতে হবে। তা নাহলে যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উক্ত বিভাগ হুমকির মুখে পড়বে বলে আমার মনে হয়।

প্রশ্ন: কর্মজীবনে সিজিপিএর গুরুত্ব কতখানি বলে আপনার মনে হয়? সিজিপিএ কমের কারনে যারা হীনমন্যতায় ভুগে তাদের ব্যাপারে আপনার কি মতামত?
উত্তরঃ অনেক সুন্দর একটা প্রশ্ন এবং এটা নিয়ে  আমার অনেক ছাত্রই হীনমন্যতায় ভোগে।আসলে সিজিপিএটা বলার জন্য খুব সুন্দর কিন্তু সত্যিকার অর্থেই জব মার্কেটে সিজিপিএর কোনও মুল্য নেই। একটা নুন্যতম সিজিপিএ থাকা উচিৎ এপ্লিকেশন করার যোগ্যতা হিসেবে, ব্যাপারটা অনেকটা গেট পাসের মতো। কিন্তু একজন এমপ্লোয়ার চায় এই মানুষটাকে দিয়ে আমার কাজটা হবে কিনা যেটা সিজিপিএ দ্বারা এনশিওর করা যায় না যে তার মাধ্যমে কাজটা সুসম্পন্ন হবে কিনা। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হওয়া দরকার, কাজের প্রতি ডেডিকেশন থাকা দরকার এবং জানা দরকার। যে জানে তার জন্য সিজিপিএ বড় কোনও বিষয় না। তাই সিজিপিএ টা এপ্লাই করার জন্য যথেষ্ট হলেই চলে বরং সিজিপিএ বেশী হলেই বিড়ম্বনা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।  

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close