উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ডিং

সালেহীন চৌধুরী, ব্র্যান্ড গবেষক, স্ট্র্যাটেজিস্ট ও ট্রেইনার

উদ্যোক্তার সাথে ব্র্যান্ডিংয়ের সম্পর্কটা অবিচ্ছেদ্য । উদ্যোক্তা না থাকলে ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা হয়তো হতো না । তারা তাদের কমফোর্টজোন এর বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা করেছেন বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন বলেই তাদের প্রোডাক্ট বা তাদের কোম্পানিকে প্রমোট করার সুযোগ পায় মার্কেটিয়ার বা ব্র্যান্ড প্রফেশনালরা । উদ্যোক্তারা আসলে ব্র্যান্ডকে কিভাবে দেখে এবং একজন ব্র্যান্ড ম্যানেজার আসলে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে  কি ধরনের সুবিধা অসুবিধা ভোগ করেন এবং তাদের করণীয় কি এই লেখাটাতে এটাই তুলে ধরবো । প্রথমে উদ্যোক্তাদের ব্র্যান্ডের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি তা তুলে ধরতে চাই : উদ্যোক্তারা সবসময় প্রফিট অরিয়েন্টেড চিন্তাভাবনা করেন । তারা ব্যবসার লাভ-ক্ষতি এবং সংখ্যা বা কলেবর বৃদ্ধিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন । দীর্ঘ সময়কালীন একটি ব্র্যান্ডের ব্যাপ্তি বা একটি ব্র্যান্ড আসলে মানুষের মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়ে যে প্রফিটকে অনেক বাড়িয়ে তুলতে পারে এই চিন্তা ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের মধ্যে থাকেনা , কিছু ভিশনারি উদ্যোক্তাদের মাঝে হয়তো চিন্তা ভাবনাটা থাকে। তারা হয়তো এই চিন্তা ভাবনাটা গোড়া থেকেই করেন এবং সব সময় সেটাকে বহাল রাখেন । মুষ্টিমেয় এই সংখ্যা দিয়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে বিচার করা যায় না । উদ্যোক্তাদের চিন্তাভাবনার ভিতরে আমরা একটু ঢোকার চেষ্টা করি । উদ্যোক্তারা আসলে ব্র্যান্ডিংকে একটি খরচের খাত হিসেবে দেখেন। অনেক সময় একজন মার্কেটিয়ার একজন সেলস পারসনকে যে ক্ষেত্রটা সাজিয়ে দেন সেখানে , যে সেলস পারসন পারফর্ম করে সেই ধরনের ব্যাপারগুলো আসলে উদ্যোক্তাদের মাথায় অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না । তারা সেলসকেই আসলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সেলসের মানুষজনকে নিয়েই সব সময় মনোযোগ দিয়ে থাকেন । মার্কেটিং এর লোকজন যারা আসলে পর্দার অন্তরালে থেকে কাজ করে যায় এবং অনেক সময় তাদের সংখ্যা দিয়ে তাদের কার্যক্রমকে হয়তো বোঝানো যায় না । বিশেষত ব্র্যান্ডিংয়ের কাজগুলোকে । তো সে ক্ষেত্রে যেটা হয় যে আসলে উদ্যোক্তাদের কাছে অনেক সময় কিছু কাজের মূল্যায়ন হয় আবার অনেক সময় কিছু কাজের মূল্যায়ন যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি তারা তখনই সেটিকে মূল্যায়ন করতে পারো না । এক্ষেত্রে কিছু কথা না বললেই নয় যে প্রোডাক্ট এর কোয়ালিটি এবং প্রাইস এবং আপনার নেটওয়ার্ক এগুলো অবশ্যই মার্কেটিংয়ের পরিধির মধ্যে পড়ে , শুধু প্রমোশন বা কমিউনিকেশন এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে আসলে হয় না । কিন্তু ব্র্যান্ড যেটাকে আমরা বলছি , ব্র্যান্ড আসলে একটি ইমেজ এর বেপার , গুড উইল এর ব্যাপার , কনফিডেন্সের এর ব্যাপার , ট্রাস্ট এর ব্যবহার । এই সবগুলোই কিন্তু ব্র্যান্ডের মাধ্যমে অর্জন হয় এবং যেটা থেকে আপনি হয়তো আরো বেশি মাইলেজ আপনার ব্যবসা ক্ষেত্রে পাবেন সে চিন্তা ভাবনাটা আসলে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আনতে হবে । আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা আরও আমরা যদি সারা বৈশ্বিক বা চায়নার বেশকিছু ব্র্যান্ডকে দেখি যেহেতু আমাদের হাতের কাছে উদাহরণ আছে তারা সব সময় আসলে দীর্ঘমেয়াদী ব্র্যান্ড গড়ার চেষ্টা করেছে । ভারতীয় এবং চীনা অনেক ব্র্যান্ড এখন সারা পৃথিবীর পরিধিতে ছড়িয়ে গেছে কারণ তারা গোড়া থেকেই অথবা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে তারা এটা অনুধাবন করেছে যে ব্র্যান্ডকে পরিশীলিত না করলে এবং ব্র্যান্ডকে ঠিক জায়গাটায় না রাখলে এবং এটাকে গুরুত্ব না দিলে হয়তো তার একটি পর্যায়ে যেয়ে আটকে যাবে , এরপরে আর যেতে পারবে না । এই ভাবনা গুলো আসলে উনাদের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছে বা কোন না কোন ভাবে গড়ে উঠেছে । এজন্য সচেতনতা , তাদের কোম্পানিগুলোর রাতারাতি বেড়ে ওঠা এবং অনেক মানুষ বৈশ্বিক বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করতে যাওয়া এই সবকিছু তাদেরকে এই ক্ষেত্রে তাদেরকে সাহায্য করেছে । 

এবার আসি ব্র্যান্ড প্রফেশনালদের কি ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি উদ্যোক্তাদের প্রতি এই ধরনের একটি ব্যাপারে । ব্র্যান্ড প্রফেশনালদের খেয়াল রাখতে হবে যেহেতু তাদের খাতটি একটি খরচের খাত এবং দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সেটা থেকে আসে সে ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ম্যানেজারদের উপরে কেন অনাস্থা কিছুটা আছে উদ্যোক্তাদের এটা বুঝতে হবে । অনেক সময় কিছু ক্ষেত্রে খরচগুলো দিয়ে হয়তো উদ্যোক্তারা সেরকম আত্মবিশ্বাস পান না ব্র্যান্ড প্রফেশনালদের উপর অথবা এমন হতে পারে যে কেন খরচগুলো দিলেন সেটা বুঝে উঠতে পারছেন না । তাদের মত দুটি অনিশ্চয়তা থাকতে পারে । একটি হচ্ছে কোন মিস ইউজ হবে কিনা অথবা আর একটি হতে পারে যে যার জন্য দিলাম সেটি আসলে আমি ক্লিয়ার বুঝতে পারছি না তো আমি সে ক্ষেত্রে আমার রেজাল্ট আসলে আসবে কিনা বা দীর্ঘমেয়াদে আসবে সেটা একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ থেকে যাচ্ছে । সে ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড প্রফেশনালরা অনেকেই নিজেদের ভাড়া বা নিজেদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করে ফেলেন । তারা হয়তো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ কার্যক্রমগুলোয় মনোযোগ দেন কিন্তু ব্র্যান্ডের যে বেসিক অংশ যেখানে কাজ করলে আসলে ব্র্যান্ডটা দাঁড়াবে সেই জায়গাগুলোতে ফোকাস করেন না দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান গুলোকে একসাথে কম্পাইল করে সেটা ম্যানেজমেন্টকে দেখাতে হয়তো পারেন না যেটা থেকে তারা স্বপ্ন দেখা শুরু করবে । অথবা কিছুটা কাজ এগিয়ে নিয়ে তাদেরকে ফলাফল দেখিয়ে আরও কাজের প্রতি টেনে নিয়ে আসা , এটা হয়তো ব্র্যান্ড ম্যানেজাররা পারছেন না । এখানে অনেকগুলো ফ্যাক্টরি আসলে কাজ করে । এই পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গাটায় কাজ করতে হলে আমাদেরকে আসলে কি করতে হবে বা করনীয় কি করা যায় সেই প্রসঙ্গে আলোচনায় আসি :প্রথমত এই দূরত্বটা ঘোচাতে হবে যেখানে উদ্যোক্তারা মনে করছে ব্র্যান্ডিং হয়তো একটি উটকো খরচ আবার ব্র্যান্ড প্রফেশনালরা মনে করছে আমি সাময়িক কিছু কাজ দেখিয়ে আমি আমার ম্যানেজমেন্টের নজরই পড়ি কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বা গভীর কাজগুলোর দিকে আমি যাব না সে ক্ষেত্রে হয়তো আপাতদৃষ্টিতে ভলো একটি অবস্থান আমার কোম্পানির ক্ষেত্রে তৈরি করতে পারবো । এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হচ্ছে যে স্বল্পমেয়াদী কাজ করলে ইন্ডাস্ট্রি বা মার্কেটে আসলে সেটা ভিজিবল হবে না এমনিতেও , সো ওই কাজটা আসলে বিফলে যাবে যেটি দিয়ে তার পোর্টফলিও বা ক্যারিয়ারের পাথটা উন্মোচিত হবে না । তো সে ক্ষেত্রে যেটা হতে পারে যে সচেতনতাই প্রধান ব্যাপার । যেকোন ফরমেটের সচেতনতা উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঢুকাতে হবে এবং উদ্যোক্তা যে ধরনের ব্র্যান্ড বা মার্কেটিং এর কাজগুলোকে একটু পছন্দ করেছেন সেগুলোকেই ধরেই এগোতে হবে । যেমন অনেক উদ্যোক্তা আজকাল ডিজিটাল এর মূল্য বুঝছেন না বা একটি ভালো ইভেন্টের মূল্য বুঝছেন না তবে তাকে একটি ভালো ইভেন্ট প্ল্যান অথবা কোনোভাবে একটি ইভেন্টে সম্পৃক্ত করা বা কোনভাবে একটি ডিজিটাল মার্কেটিং এর ক্যাম্পেইনে সম্পৃক্ত করা, এই ধরনের কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে । এছাড়াও গ্যাপটা কমানোর জন্য যেটা করে যেতে পারে যে-এটা সামগ্রিকভাবে বলছি , ব্র্যান্ড ম্যানেজাররা বা বেশ কয়েকটি কোম্পানির ব্র্যান্ড ম্যানেজার অথবা একই ইন্ডাস্ট্রির ব্র্যান্ড ম্যানেজাররা মিলে যদিও উদ্যোক্তাদের একটি সম্মেলনের মাধ্যমে অথবা একটি সেমিনার বা সেশনের মাধ্যমে যদি তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারেন কোন একটি বাৎসরিক ইভেন্ট , যেটা ব্র্যান্ড ম্যানেজাররাই তাদের নিজেদের সংগঠন থেকে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রপোজ করলেন এরকম যদি কিছু হয় সে ক্ষেত্রে এই দূরত্বটা খুব তাড়াতাড়ি ঘুচতে পারে । অথবা কোন একটি ম্যাগাজিন বা কোন একটি গ্লোবাল ম্যাগাজিন বা কোন একটি লোকাল ম্যাগাজিন যেটা আসলে ব্র্যান্ডিং নিয়ে লিখে যাচ্ছে সেই ধরনের ম্যাগাজিনগুলো স্যুভেনির কপি সেটাও যদি ম্যানেজমেন্ট এর সাথে শেয়ার করা হয় তাহলে তারা এটার মূল্য বুঝতে পারবেন এবং সে ক্ষেত্রে তারা এটাকে প্রায়রিটি হিসেবে রাখবেন । আর প্রাত্যহিক সময়গুলোতে ব্র্যান্ড ম্যানেজার , মার্কেটিং প্রফেশনাল তারা তো আসলে উদ্যোক্তাদের সাথে সরাসরি কাজ করেন । তো তাদের কাজকে যতটুক ডাটা দিয়ে ব্যাকআপ দিতে পারবেন , যে ফলাফল দেখা যাচ্ছে একটু সময় নিয়ে । প্রথমত একটু সময় চেয়ে নিতে হবে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে এবং নির্দিষ্ট ওই সময় কি পরিমাণ খরচ করে কি পরিমাণ রেজাল্ট পাওয়া গিয়েছে এবং নরমাল ওই সময় কি পরিমাণ ব্যবসা ছিল এই ধরনের একটি ব্যাপার এবং যদি দেখানো যায় অথবা একটি ভালো ভিডিও ব্র্যান্ডের জন্য তৈরি করে সেখানে যদি অনেক মানুষের মতামতকে সম্পৃক্ত করা যায় যে ব্র্যান্ডটা সম্পর্কে তারা কি ভাবছে , আগে কি ভাবতো , বর্তমানে কি ভাবছে এই ধরনের কিছু এওয়ারনেস ক্যাম্পেইন করেও আসলে উদ্যোক্তাদের ব্র্যান্ডের একটি দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের দিকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে । তো এই ধরনের কিছু করা যেতে পারে উদ্যোক্তাদের সাথে ব্র্যান্ড প্রফেশনালদের , মার্কেটিং প্রফেশনাল দূরত্ব কমানোর জন্য এবং সর্বোপরি কোম্পানিকে একটি ফলাফল নির্ভর দিকের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য । ব্র্যান্ড প্রফেশনাল এবং উদ্যোক্তারা আসলে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাক । তারা একে অপরকে একটি গঠনমূলক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একে অপরের সম্পূরক হিসেবে কাজ করুক এবং একে অপরের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক শ্রদ্ধার জায়গাটা থেকে বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী ব্র্যান্ডকে আরও অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাক এই ধরনের একটি প্রত্যাশা রাখছি । এবং অবশ্যই উদ্যোক্তা এবং ব্র্যান্ড প্রফেশনালদের মিলবন্ধনই আসলে হতে পারে একটি যুগোপযোগী ও কালজয়ী ব্র্যান্ডের গঠনের প্রাথমিক উপাদান । ধন্যবাদ ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close